ডায়াবেটিস কি, লক্ষণ, ধরন, নির্ণয়, ঝুঁকি, জটিলতা ও চিকিৎসা

ডায়াবেটিসের লক্ষণ , ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা শুধু বয়স্কদের নয়, তরুণ শিশু এমন কি গর্ভবতী নারীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এক সময়ে এই রোগীর সংখ্যা অনেক কম ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি বিশ্বজুড়ে একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

ডায়াবেটিস-কি,-লক্ষণ,-ধরন,-নির্ণয়,-ঝুঁকি,-জটিলতা-ও-চিকিৎসাবিশেষ করে টাইপ ২- ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অনেকে স্পষ্ট ভাব বা লক্ষণ অনুভব করেন না। তবে সময় মতো রোগটি শনাক্ত করা গেলে, সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সঠিক জীবন যাপনের মাধ্যমে এটি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সূচিপত্র

ডায়াবেটিসের লক্ষণ

ডায়াবেটিসের সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় এ রোগের লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে বুঝা যায় না, প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষণগুলো দ্রুত সনাক্ত করতে পারলে সময় মত  চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। এই রোগে রক্তের শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকার ফলে শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। সেই জন্য শারীরিক পরিবর্তনকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।

ডায়াবেটিসের পরিচিত লক্ষণ গুলোর মধ্যে হচ্ছে ঘনঘন প্রসব হয়, অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্ষুধা অনুভব করা, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা ক্লান্তি এবং চোখে ঝাপসা দেখা। এছাড়া শরীরের কোন জায়গার ক্ষত অতি সহজে না শুকানো, ত্বক বারবার  সংক্রমিত হওয়া, হাত-পা অবশ হওয়া, ঝিন ধরার মতো সমস্যাও ডায়াবেটিসের লক্ষণ , হতে পারে। কিন্তু এসব লক্ষণ যে সকল মানুষের ক্ষেত্রে একই ভাবে তা কিন্তু না। 

অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষণ খুব দ্রুত প্রকাশ পায়, আবার কারো ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। আপনি যদি ডায়াবেটিসের লক্ষণ , সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে চান, তাহলে সর্বপ্রথম আপনাকে জানতে হবে ডায়াবেটিস কি, কেন হয়, সে সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ শরীর যখন  পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, বা উৎপাদিত ইনসুলিনের সঠিক ব্যবহার করতে পারেনা, তখন রক্তে শর্করা বেড়ে যায়। এতে বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। বিভিন্ন ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে যেমন টাইপ -১, টাইপ -২ ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। এসব লক্ষণ  ব্যক্তি বুঝে  কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সেই কারণে রোগের ধরন সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র শারীরিক লক্ষণ দেখে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায় না। 

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় একজন ব্যক্তি ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত কিনা। তাই শারীরিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে আমরা সাধারণত প্রথমে একটু আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ি। ডায়াবেটিসের লক্ষণ , কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক উন্নত, আমরা আতঙ্ক না হয়ে সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করায় সবচেয়ে বেশি ভালো হবে বা উচিত।

বর্তমানে স্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ওজন নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন অনুযায়ী ঔষধ বা ইনসুলিনের ব্যবহার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। তবে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হতে পারে। কিছু মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনুযায়ী তুলনায় বেশি থাকে, যেমন পারিবারিক ডায়াবেটিসের ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন, অনিয়মিত জীবনযাপন, পরিশ্রম কম করা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস এবং উচ্চ রক্তচাপের মত সমস্যা গুলো ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাই যাদের এসব  ঝুঁকি রয়েছে তাদের আরো বেশি সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরী সময় । দীর্ঘদিন ধরে শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। যার ফলে চোখ, কিডনি, হৃদ যন্ত্র, স্নায়ু ও পায়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সময় মত রোগ সনাক্ত করার পর, নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এসব  জটিলতা থেকে  নিজেকে অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব। যদি বারবার পানি খাওয়ার তৃষ্ণা জাগে, ঘনঘন প্রসব হয়, অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব হয়, কোন কারণ ছাড়াই শারীরিক ওজন কমতে থাকে। 

অথবা অন্য কোন সন্দেহজনক লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে দেখা যায়, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পরিমাণের ঘুম ও ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। আমার এই লেখায় পরবর্তী অংশে ডায়াবেটিস কি এর বিভিন্ন ধরন, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, ঝুঁকির কারণ, জটিলতা, চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার সঠিক সময় এবং প্রতিরোধের কার্যকর উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ডায়াবেটিস কি

ডায়াবেটিস দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা। যেখানে শরীরের রক্তে থাকা গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। সাধারণত আমাদের শরীরের  অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন তৈরি হয়। এই ইনসুলিন রক্তে থাকা গ্লুকোজকে শরীরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। যার ফলে  কোষগুলো তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে । কিন্তু যখন শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না বা তৈরি হলেও সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তখন শর্করা শরীরের কোষে প্রবেশ করতে পারে না, যার ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং ডায়াবেটিসের সমস্যা দেখা দেয়।

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ। এ রোগ কে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সময় মত রোগটি শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস বজায় রাখা এবং সঠিক জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। এই রোগটিকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে, আপনার শরীরে বিভিন্ন অঙ্গের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে আপনার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রথমেই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরী্।

ডায়াবেটিসের ধরন

সব মানুষের ডায়াবেটিসের ধরন এক রকমের না। এ রোগের কয়েকটি ধরন রয়েছে এবং প্রতিটি ধরনের কারণ ও বৈশিষ্ট্য অনেকটাই আলাদা। তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তিন ধরনের ডায়াবেটিস এগুলো হলো, টাইপ -১ ডায়াবেটিস, টাইপ -২ ডায়াবেটিস এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস।

টাইপ -১ ডায়াবেটিস

শরীর যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারেনা তখন টাইপ -১ ডায়বেটিস দেখা দেয়। এ ধরনের ডায়াবেটিস অনেক সময় শিশু-কিশোর বা তারুণ্য বয়সেই হয়ে থাকে। এই রোগটি দ্রুত প্রকাশ পেতে পারে, তাই দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

টাইপ -২ ডায়াবেটিস

টাইপ টু ডায়াবেটিসটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।  এই ডায়াবেটিসটি হলে আপনার শরীর উৎপাদিত  ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেনা অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হয় না। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে হয়ে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে, শুরুতে স্পষ্ট কোন লক্ষণ দেখা যায় না।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস

এই ডায়াবেটিসটি গর্ভ অবস্থায় কিছু নারীর মধ্যে দেখা দিতে পারে।  সাধারণত সন্তান জন্মের পরে সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়, তাদের ভবিষ্যতে টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া ডায়াবেটিসের আরো অনেক ধরন রয়েছে। যদিও এসব খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। তবুও চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে, রোগের ধরন নির্ণয় করে, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ডায়াবেটিস কিভাবে নির্ণয় করা হয়

শুধু লক্ষণ দেখে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। এজন্য চিকিৎসককে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয়। বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কেমন আছে। পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ডায়াবেটিস,  প্রি ডায়াবেটিস অথবা গর্ভকালীন  ডায়াবেটিস সনাক্ত করা হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসকরা কয়েকটি পরীক্ষা ব্যবহার করেন।

এর মধ্যে ফাস্টিং প্লাজমা গ্লুকোজ ( FPG ) পরীক্ষা অন্যতম। এই পরীক্ষার আগে অন্তত ৮ ঘন্টা সকল ধরনের খাবার থেকে বিরত থাকতে হয়। এরপর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হল A1C পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে গত প্রায় তিন মাসে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই দীর্ঘ সময়ের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবস্থা মূল্যায়নে এই পরীক্ষাটি ব্যবহার করা হয়।
ডায়াবেটিস-কি,-লক্ষণ,-ধরন,-নির্ণয়,-ঝুঁকি,-জটিলতা-ও-চিকিৎসা
প্রয়োজনে র্যান্ডম প্লাজমা গ্লুকোজ পরীক্ষা করা হয়। এতে রোগী সর্বশেষ কখন খাবার খেয়েছেন সেটা বিবেচনা করে পরীক্ষা করা যায়। জরুরী পরিস্থিতিতে এই পরীক্ষার রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।এছাড়া ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট ( OGTT ) ব্যবহার করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে টাইপ টু ডায়াবেটিস, প্রি ডায়াবেটিস এবং গর্ভকালীন ডায়বেটিস শনাক্ত করতে চিকিৎসকদের সহায়তা করে। কোন ব্যক্তির জন্য কোন পরীক্ষা উপযুক্ত হবে তা রোগের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শের উপর নির্ভর করে। তাই ডায়াবেটিসের লক্ষণ , দেখা দিলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসা

ডায়াবেটিসের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হচ্ছে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখা এবং ভবিষ্যতে জটিলতার ঝুঁকি কমানো। এজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং প্রয়োজন হলে ঔষধ ব্যবহার করা দরকার। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সুষম স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস যথেষ্ট পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য খাবারের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে খাওয়া, পরিমিত পরিমাণে খাবার গ্রহণ করা এবং আঁশযুক্ত খাবার খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।

এর পাশাপাশি পরিশোধিত শস্য বা অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রান্নার জন্য অলিভ অয়েল বা ক্যানোলা অয়েলের মত স্বাস্থ্যকর তেল বেছে নিয়ে রান্না করলে তা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। আপনার  শারীরিক পরিশ্রমও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সপ্তাহে বেশিরভাগ দিন নিয়মিত ব্যায়াম করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকলে তা শরীরের জন্য ক্ষতি হতে পারে।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ , যার কারণে মাঝেমধ্যে হাঁটাচলা করা ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে অনেক উপকার বয়ে নিয়ে আসতে পারে। যদি খাদ্যভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রক্তে  শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না হয়, তাহলে ডাক্তার রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে নিজ থেকে কোন ওষুধ শুরু করা অথবা বন্ধ করা শরীরের জন্য মঙ্গল হবে না। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলায় উচিত। 

ডায়াবেটিসের ঝুঁকির কারণ

বিভিন্ন কারণে ডায়াবেটিস মানুষের শরীরে বাসা বাঁধে। এমন কিছু বিষয় আছে যা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তাই এসব ঝুঁকির কারণে আগে থেকেই সচেতন হওয়া দরকার। তাহলে সমস্যার সময় দ্রুতপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় । আমাদের বয়স ডায়াবেটিসের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। ৩০ বছরের পর টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া পরিবারের মা, বাবা, ভাই, বোনদের ডায়াবেটিস থাকলে আপনার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়।

শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনাকে অনেক বাড়িয়ে দেয় । আপনি যদি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করেন অথবা সঠিক জীবনযাপন না করেন। তাহলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিসের লক্ষণ , উচ্চ রক্তচাপ ও ধূমপান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় এবং ভবিষ্যতে অনেক শারীরিক জটিলতা তৈরি করে।

যাদের আগে থেকে প্রি ডায়াবেটিস নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ( NAFLD ) অথবা পলিসিস্টিক ওভার সিনড্রোম ( PCOS ) রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায় । আপনার শরীরে এসব কারণ বিদ্যমান থাকলে আপনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া এবং সঠিক জীবন যাপন করলে এ রোগের ঝুঁকি থেকে অনেকটা নিজেকে রক্ষা করা যায়।

ডায়াবেটিস থেকে কি ধরনের জটিলতা হতে পারে

ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে আপনার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরের বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এ নিয়মিত চিকিৎসা স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের মাধ্যমে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখলে এ রোগের জটিলতার ঝুঁকি থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়। ডায়াবেটিসের কারণে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এতে কিডনির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার ফলে পরবর্তীতে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া চোখের রক্তনালির ক্ষতি হয় সম্ভাবনা আছে, যার ফলে দৃষ্টিশক্তির কমে যেতে পারে । এগুলো কারনে ডায়াবেটিস রোগীর নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা জরুরী। ডায়াবেটিসের লক্ষণ  ডায়াবেটিস স্নায়ুতন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। যার ফলে হাত পায়ে ঝিনঝিন, অবশ হওয়া ভাব বা অনুভূতি কমে যাওয়ার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে । 

কোন কারণবশত পায়ে ক্ষত হলে তা অতি সহজে শুকাতে চায় না। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। যার কারনে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা এবং যেকোনো ধরনের শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। সময়মত সচেতনতা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত অনেক জটিলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায় ।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত

ডায়াবেটিসের লক্ষণ , দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরী। কিছুক্ষণ পর পর তৃষ্ণা লাগা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ক্ষুধা, ওজন দ্রুত কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি অথবা চোখে ঝাপসা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এসব লক্ষণ ডায়াবেটিসের ইঙ্গিত প্রকাশ করে। তাই অবহেলা করা উচিত না। যাদের বয়স ৩৫ বা তার বেশি, তাদেরকে নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত।
ডায়াবেটিস-কি,-লক্ষণ,-ধরন,-নির্ণয়,-ঝুঁকি,-জটিলতা-ও-চিকিৎসা
এছাড়া যাদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে এছাড়া ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় এমন ধরনের সমস্যা বা কারণ আছে। তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোন পরীক্ষার ফলাফলে যদি প্রি ডায়াবেটিস ধরা পড়ে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরী । এর মাধ্যমে রক্তের শর্করার মাত্রার পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এবং প্রয়োজন হলে সময় মত ব্যবস্থাও নেওয়া যায়।

অপরদিকে যাদের আগে থেকে ডায়াবেটিস রয়েছে তাদেরও চিকিৎসকের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ফলোআপে থাকা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রক্তের শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে গেলে ডায়াবেটিস রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয়। যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব ।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কার্যকর উপায়

সব ধরনের ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা না গেলেও, বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিসর ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের মাধ্যমে কমানো যায় । তাই প্রতিদিনের জন্য কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা এ রোগ প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে । ডায়াবেটিস টু ,স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য অভ্যাসের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব । প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ডাল, গোটা শস, খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শর্করা,অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কম পরিমাণে খাওয়ায় ভালো।
 
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করলে ডায়াবেটিসের ঝুকি কমানো সম্ভব। প্রতিদিন হাঁটা বা অন্য শারীরিক কার্যক্রম শরীরকে সক্রিয় রাখে। এর ফলে রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। শরীরে স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদের দৈহিক ওজন বেশি তারা ওজন কমানোর মাধ্যমে টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পারেন। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে পরিত্যাগ করতে হবে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো শরীরের জন্য ভালো । যাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তারা ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরী।
 

লেখকের মন্তব্য 


ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা এ রোগটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে আপনার শরীরের অঙ্গে ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে পারে যা পরবর্তীতে মৃত্যুরমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এ রোগ সম্পর্কে সচেতন হলে, সময় মত নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা করলে, সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করা যায়। তাই ডায়াবেটিস লক্ষণ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকা উচিত । 

যদি সন্দেহজনক কোন উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরী । এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, শারীরিক ওজন নিয়ন্ত্রণ, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি যাদের আছে ,তাদের ক্ষেত্রে বেশি সচেতন হওয়া উচিত এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন ।  

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

রবিন ব্লগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url