উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা
উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা, উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যেখানে রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় বেশি থাকে। সাধারণত কোন ব্যক্তির রক্তচাপ ১৪০ / ৯০ mmHg- এর বেশি হলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন আক্রান্ত বলে ধরা ধরে নেওয়া হয়।
প্রতিবছর ১৭ মে বিশ্ব উউচ্চ-রক্তচাপ-রোগীর-খাদ্য-তালিকা চ্চ রক্তচাপ দিবস পালন
করা হয়। এই দিনটি উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হয় এবং এর ঝুঁকি
সম্পর্কে অবহিত করা হয়। World Hypertension League (WHL) ২০০৫ সালে উচ্চ রক্তচাপ
দিবস চালু করে।
সূচিপত্র
- উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা
- উচ্চ রক্তচাপ কি
- উচ্চ রক্তচাপের কারণ
- উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ
- খাদ্যাভ্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ
- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার খেতে হবে
- উচ্চ রক্তচাপে যেগুলো খাবার এড়িয়ে চলতে হবে
- একদিনের খাদ্য তালিকার
- উচ্চ রক্তচাপের প্রতিকার
- বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
- লেখকের মন্তব্য
উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা
উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসারকে নীরব ঘাতক বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এর স্পষ্ট
লক্ষণ দেখা যায় না। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত। শুধু
বয়স্করাই নয়, যেকোনো বয়সের মানুষের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে।
অনিয়মিত জীবন যাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের
অভাব, এ সমস্যা ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট
রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক সহ বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে এটি রোগীর জীবন হানির কারণও হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে
মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা এবং বুক ধরফড় করার মত কিছু উপসর্গ দেখা যেতে পারে। দিন দিন
গোটা বিশ্বে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য
তালিকা, এই রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধের পাশাপাশি সঠিক খাদ্য অভ্যাস ও
জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। তবেই দীর্ঘমেয়াদী ফল পাওয়া সম্ভব।
Balanced Diet Chart অনুযায়ী খাবার খেতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, গোটা শস্য,
কম চর্বিযুক্তপ্রোটিন খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।
উচ্চ রক্তচাপ রোগ হলে ধমনীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত রক্ত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চাপ
সৃষ্টি করে। আপনার শরীরে দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকলে
হৃদপিণ্ড, কিডনি, চোখ এবং মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। আমাদের জীবনের
দৈনন্দিন খাদ্য উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার। আমরা যে খাবার খায় তা
সরাসরি রক্তচাপের উপর প্রভাব ফেলে। সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে রক্তনালীর কার্যকারিতা
ভালো থাকে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাজা ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ,
গোটা শস্য, জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া উচিত।
এসব খাবারে থাকা পুষ্টি উপাদান শরীরের প্রয়োজনীয় ও খনিজ উপাদান সরবরাহ করে এবং
হার্টকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার যেমন চিপস, ফাস্টফুড,
প্রক্রিয়াজাত মাংস, অতিরিক্ত তেল, কোমল পানীয় এবং চর্বিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব
এড়িয়ে চলায় ভালো। উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা, এসব খাবার রক্তচাপ বৃদ্ধি
এবং হৃদ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ রোগীর দৈনিক খাদ্য
তালিকায় সকালে স্বাস্থ্যকর নাস্তা, দুপুরে পরিমিত ভাত বা রুটি, মাছ বা ডাল
প্রচুর শাক সবজি থাকা উচিত।
বিকেলে ফল বা হালকা নাস্তা এবং রাতে সহজপাচ্য ও কম লবণযুক্ত খাবার গ্রহণ করা
ভালো। সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরী। ডাক্তারেরা উচ্চ রক্তচাপ
নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো এবং ধূমপান
থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আপনাকে
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলাফেরা করতে
হবে।
উচ্চ রক্তচাপ কি
সাধারণত একজন সুস্থ মানুষের রক্তচাপ ১২০/৮০ মিলিমিটার মার্কারি হিসাবে ধরা হয়।
তবে কারো রক্তচাপ যদি ১৪০ / ৯০ মিলিমিটার মার্কারি বা এর বেশি হয় তাহলে তাকে
উচ্চ রক্তচাপ বলা যেতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ বয়স ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে
এই মাত্রা কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপে ভোগে তা
বুঝতে পারে না। উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা, তবে কিছু ক্ষেত্রে মাথাব্যথা,
মাথা ঘোরা, ঘাড় ব্যথা, বুক ধরফর করা বা চোখে ঝাপসা দেখার মতন উপসর্গ দেখা দিতে
পারে। লক্ষণ না থাকলেও রোগটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের পিছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক
পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, বংশগত কারণ
এবং মানসিক চাপ এর মধ্যে অন্যতম। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্যকর
জীবনধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুষম খাদ্য গ্রহণ, লবণের পরিমাণ কমানো,
নিয়মিত ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপমুক্ত থাকা রক্তচাপ স্বাভাবিক
রাখতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি ধূমপান ও অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাস পরিত্যাগ করতে
হবে।
উচ্চ রক্তচাপের কারণ
উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানান না গেলেও দৈনন্দিন জীবন যাপনের
বিভিন্ন অনিয়ম ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ নিম্নে আলোচনা করা হলো।
অতিরিক্ত ওজন
অতিরিক্ত ওজন উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে
গেলে রক্তনালীর ভেতরে চর্বির স্তর তৈরি হতে পারে। যা রক্ত প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত
করে। ফলে রক্তনালীর উপর চাপ বৃদ্ধি পায় এবং রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যভ্যাস
সুস্থ জীবন যাপনের জন্য সুষম পরিকল্পিত খাদ্য অভ্যাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
অতিরিক্ত তেল যুক্ত, চর্বিযুক্ত, ভাজাপোড়া এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়মিত খেলে
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে এবং রক্ত
নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস অনুসরণ করা জরুরী।
মানসিক চাপ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ উদ্বেগ এবং বিষন্নতা উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে
পারে। এসব অবস্থায় শরীরে অ্যাড্রিনালিন ও কর্টিসোল হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়, যার
ফলে রক্তনালি সংকুচিত হতে পারে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাব
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম না হলে শরীরের ক্লান্তি ও মানসিক চা বৃদ্ধি পায়।
দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে তা উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।
কায়িক পরিশ্রমের অভাব
নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা শারীরিক কার্যকলাপ না করা, উচ্চ রক্তচাপের আরেকটি
গুরুত্বপূর্ণ কারণ। শারীরিক ভাবে নিষ্ক্রিয় জীবন যাপন করলে, শরীরে অতিরিক্ত
চর্বি জমতে পারে এবং ওজন বৃদ্ধি পায়, যা রক্তচাপ বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। রক্তচাপ
রোগীর খাদ্য তালিকা, নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকান্ড রক্ত
সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ
উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত ধীরে ধীরে বিকশিত হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে বিরাজ করতে
পারে। এটি যে কোন বয়সের মানুষের মধ্যে দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একজন
ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবত উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত থাকলেও কোনো স্পষ্ট লক্ষণ অনুভব
করে না। তবে লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও এই অবস্থায় রক্তনালি হৃদপিণ্ড কিডনি এবং
শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কারণে শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে রক্ত পড়া,
মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘাড় ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও এসব
কারণ উচ্চ রক্তচাপের জন্য নির্দিষ্ট নয়। সাধারণত যখন খুব বেশি রক্তচাপ
বেড়ে যায় বা রোগটি গুরুতর অবস্থায় পৌঁছে যায় তখন এ ধরনের উপসর্গ প্রকাশ
পেতে পারে।
খাদ্যভ্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ
উচ্চ রক্তচাপ একটি দীর্ঘ মেয়াদী জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে
হলে সঠিক খাদ্যভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভরশীল হলে
কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায় না। আশানুরূপ ফলাফল পেতে হলে খাদ্য গ্রহণের
ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা
করে এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিনের খাদ্য সরাসরি
রক্তের উপর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায়
যা রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
অপরদিকে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ খাবার উচ্চ
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন খনিজ উপাদান ও
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। যা রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য
করে। কলা, কমলা, পেয়ারা, টমেটো, পালং শাক, এবং অন্যান্য সবুজ শাকসবজিতে থাকা
পটাশিয়াম শরীরের সোডিয়ামের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে
সাহায্য করে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার খেতে হবে
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে, এমন কিছু খাবার রয়েছে যা রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে যেমন
কলা
কলা পটাশিয়ামের একটি ভালো উৎস, এর খনিজ উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ সাহায্য
করে। প্রতিদিন অন্তত একটি কলা খাওয়া উপকারী হতে পারে।
আপেল
আপেলে বিদ্যমান পলিফেনোল রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
দেশীয় মৌসুমী ফল ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল
লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমড়া এবং আমলকিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি ও
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এসব উপাদান রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায়
রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ সাহায্য করে। একইভাবে রঙিন শাকসবজিতে
থাকা পটাশিয়াম ম্যাগনেশিয়াম ও ফোলেট রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।
পালং শাক
পালং শাকে উচ্চ মাত্রায় পটাশিয়াম রয়েছে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
গাজর
গাজরে উপস্থিত ফেনোলিক যৌগ রক্তনালিকে শিথিল করতে সাহায্য করে, ফলে রক্তচাপ
কমাতে পারে।
টমাটো
টমেটো বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ, এতে থাকা পটাশিয়াম ও ক্যারোটিনয়েডস
রক্তচাপ কমাতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
ব্রকলি
ব্রকলিতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তনালীর কার্যক্ষমতা উন্নত
করে, যার রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ
এসব মাছে ওমেগা -৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যা হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায়
রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
রসুন
রসুনের সালফার জাতীয় উপাদান রক্তনালীর নমনীয়তা বৃদ্ধি করে। এছাড়া এতে থাকে
অ্যালিসিন যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন খাবারের
সঙ্গে এক থেকে দুই কোয়া রসুন খাওয়া উপকারী।
ওটস
উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ওটস একটি উপকারী খাদ্য এতে কম ক্যালোরি
এবং বেশি পরিমাণ খাদ্য আঁশ থাকে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
বাদাম
বাদামে সোডিয়াম তুলনামূলক কম এবং পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম বেশি থাকে। এর
পাশাপাশি এতে থাকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
অলিভ অয়েল ও সানফ্লাওয়ার অয়েল
এই তেল হৃদপিন্ডের জন্য উপকারী হিসেবে বিবেচিত হয়।
উচ্চ রক্তচাপে ডিম ও দুধ খাওয়া
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে প্রতিদিন একটি ডিম এবং এক কাপ সরবিহীন দুধ পান করা যেতে
পারে। এটি শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।
উচ্চ রক্তচাপে যেগুলো খাবার এড়িয়ে চলতে হবে
শরীরে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিলে যেগুলো খাবার এড়িয়ে চলতে হবে তার ছোট্ট একটি
তালিকা নিম্নে দেওয়া হলো।
লবণ
উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত লবণ ক্ষতিকর। খাদ্য
তালিকায় সোডিয়ামের পরিমাণ সীমিত রাখা উচিত। তাই রান্না করা খাবারের
সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ যোগ করার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
আচার
আচার দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য এতে প্রচুর লবণ ব্যবহার করা হয়। তাই উচ্চ
রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্য তালিকা থেকে আচার বাদ দেওয়া উচিত।
প্রক্রিয়াজাত মাংস
প্রক্রিয়াজাত মাংসে সাধারণত সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে
দিতে পারে। এ কারণে এ ধরনের খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
টিন জাত খাবার
টিন জাত খাবার সংরক্ষণের জন্য লবণ ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব খাবারে সোডিয়ামের
মাত্রা বেশি থাকে। টিনজাত স্যুপ, ঝোল ও স্টকের পরিবর্তে কম সোডিয়ামযুক্ত
খাবার নির্বাচন করা ভালো।
চিনি
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ডায়াবেটিস ও স্থুলতার ঝুঁকি বাড়ানোর
পাশাপাশি রক্তচাপও বৃদ্ধি করতে পারে। যেহেতু অতিরিক্ত ওজনের মানুষের
মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বেশি দেখা যায়, তাই চিনি যুক্ত খাবার এড়িয়ে
চলা উচিত।
মুরগির চামড়া
মুরগির মাংসের তুলনায় এর চামড়ায় চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। যা রক্তচাপের উপর
নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে লাল মাংস ও মাখনেও প্রচুর চর্বি থাকে, যা
উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য উপযুক্ত নয়।
কফি
যারা নিয়মিত কফি বা ক্যাফেইন জাতীয় পানি পান করেন, তাদের জন্য এটি সীমিত করা
প্রয়োজন। কারণ ক্যাফেইন সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অ্যালকোহল
গবেষণায় দেখা গেছে অ্যালকোহল পান করলে সাময়িকভাবে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া অ্যালকোহল উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ঔষধের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব
ফেলতে পারে।
একদিনের খাদ্য তালিকা
সকালের নাস্তা
দিনের শুরুতে এক বাটি ওটস বা ডালিম খাওয়া যেতে পারে এগুলো খাদ্য, আঁশ সমৃদ্ধ।
এগুলো খাদ্য সহজে হজম হয়। এর সঙ্গে আপেল, পেয়ারা, কমলার মত একটি ফল
রাখা ভালো। পাশাপাশি এক গ্লাস কম চর্বিযুক্ত দুধ অথবা এক বাটি টক দই খাওয়া
যেতে পারে, যা শরীরকে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন সরবরাহ করে।
দুপুরের খাবার
দুপুরের খাবারে পরিমিত পরিমাণ বাদামি চালের ভাত অথবা আটার রুটি রাখা যেতে পারে
এর সঙ্গে পালং শাক, ব্রকলি, গাজর বা মিষ্টি কুমড়ার মত সবজি এবং এক বাটি মুসুর
ডাল বা ছোলা খাওয়া উপকারী। এছাড়া এক টুকরো মাছ খাদ্য তালিকায় রাখা যেতে
পারে।
বিকেলের নাস্তা
বিকেলে লবণ বিহীন কাঠবাদাম, আখরোট বা কাজুবাদাম পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে
পারে এর সঙ্গে কলা বা অন্য কোন তাজা ফল রাখা যেতে পারে।
রাতের খাবার
রাতের খাবারে আটার রুটি, সবজি বা সালাত রাখা ভালো। সালাতে টমাটো, শসা,
লেটুস ও ব্রকলি ব্যবহার করা যেতে পারে। এর সঙ্গে গ্রিল বা বেগ কড়া মুরগির মাংস
কিংবা মাছ খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত তেলে রান্না করা খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
খাবার শেষে অল্প পরিমাণ টকদই খাওয়া যেতে পারে।
কিছু পরামর্শ
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে লবণ গ্রহণ কমানো জরুরী। প্রতিদিন প্রায় ১৫শো মিলি
গ্রাম বা তার কম সোডিয়াম গ্রহণের চেষ্টা করা উচিত। সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ
পানি পান করা প্রয়োজন। চা, কফি ও ক্যাফেইন যুক্ত, কোমল পানীয় সীমিত পরিমাণ
গ্রহণ করা ভালো। রান্নায় তেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত রাখা উচিত।
ধুমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে এবং নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস
গড়ে তুলতে হবে। এতে দেহ মন সুস্থ থাকবে।
উচ্চ রক্তচাপের প্রতিকার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপের কারণে প্রতিবছর
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৪ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এটি বর্তমানে অসুস্থতা ও
মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবচিত। উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা,
বিশেষজ্ঞদের মতে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের উপর নেতিবাচক
প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় যা মস্তিষ্কে
রক্তক্ষরণের কারণ হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি প্রাণহানিরও কারণ হতে পারে।
স্ট্রোকের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানো, শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে
যাওয়া, কিংবা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ,
হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন রক্তচাপ
অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কিডনি বিকলের
মতন জটিলতার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ রোগের খাদ্য তালিকা, তাই
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও
নিয়ন্ত্রণে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করা প্রয়োজন। খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত বা আলাদা
করে লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। শরীরের ওজন স্বাভাবিক সীমার মধ্যে
রাখার চেষ্টা করতে হবে।
প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি ফলমূল অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করার প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর
রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী।
তামাক ও তামাক জাত পণ্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যাপ্ত নিয়মিত ঘুম,
মানসিক চাপ কমিয়ে রাখা এবং স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে
সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এর পাশাপাশি চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঔষধ সেবন
করতে হবে এবং তার পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
উচ্চ রক্তচাপ একটি দীর্ঘ মেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা। যা অবহেলা করলে হৃদরোগ,
স্ট্রোক, কিডনির জটিলতা সহ শারীরিক অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। উচ্চ
রক্তচাপ রোগীর খাদ্য তালিকা, যার কারণে চিকিৎসকেরা উচ্চ রক্তচাপকে নিয়মিত
পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন ।
চিকিৎসকদের মতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আপনাকে সচেতনতা হবে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস, এবং নিয়মিত শারীরিক
কার্যকলাপ ধরে রাখতে হবে। এসব অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে চললে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে
রাখা সহজ হয় এবং উচ্চ রক্তচাপ জনিত অনেক জটিলতার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হয়।
লেখকের মন্তব্য
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলে জীবনের অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন
আনা দরকার। আপনাকে মানসিক চাপ দুশ্চিন্তা মুক্ত ও অবসাদ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা
করতে হবে। খুব বেশি শারীরিক পরিশ্রম না করে, প্রতিদিন সকালে কিছু সময় দ্রুত
হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে এবং খাদ্যদ্রব্য
পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ঔষধ /
খাদ্য গ্রহণ বা বর্জন করা যাবেনা।
অতিরিক্ত ওজন শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যদি অতিরিক্ত ওজন থেকে থাকে তাহলে ওজন
নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত ডায়েট অনুসরণ করতে হবে। মূল কথা, আপনি যদি সুস্থ
থাকতে চান তাহলে আপনাকে সঠিক খাদ্যভাস, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং
দুশ্চিন্তা মুক্ত জীবন যাপন অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট
অভ্যাসগুলো পরিবর্তন গুলো উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়ক হিসেবে কাজ
করবে।
.webp)
.webp)
রবিন ব্লগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url